কারিগরি শিক্ষা হতে পারে বেকারমুক্ত সমাজ গঠনের হাতিয়ার

adminadmin
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০৮:৩৭ AM, ২০ অগাস্ট ২০২২

মানুষের মৌলিক চাহিদার মধ্যে শিক্ষা অন্যতম। কারণ শিক্ষা মানুষের জীবন ও জীবিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক ও যুগোপযোগী শিক্ষা মানুষের কর্মসংস্থান যোগাতে সহায়ক। অন্যদিকে গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার হার বাড়ানোর সাথে সাথে বেকারত্ব ও বাড়ায়। তাই প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা বা কর্মমূখী শিক্ষাটা স্কুল থেকেই দরকার। কারণ অধ্যাপক ননিয়েলেসাউক্স ও অন্যান গবেষকগণের মতে – কারিগরি শিক্ষার পরিবেশ শৈশব থেকে শুরু হওয়া দরকার। যা হবে জীবনমূখী ও আনন্দময়।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে দেশের সীমিত সম্পদের উপর চাপ বেড়ে যাচ্ছে ৷ ফলে বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের সংখ্যা ও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখন একমাত্র উপায় অধিক জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রুপান্তর করা, আর এর সবচেয়ে সময়োপযোগী ও সঠিক উপায় হল নতুন প্রজন্মকে কারিগরি বা কর্মমূখী শিক্ষায় শিক্ষিত করা। সরকার এ বিষয়টি উপলব্ধি করে দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষে অষ্টম শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা সংশ্লিষ্ট নূন্যতম একটি সাবজেক্ট বাধ্যতামূলক করতে যাচ্ছে।

আমাদের দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বড় একটি ভূমিকা রাখে প্রবাসীদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক রেমিট্যান্স পাঠানোর মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিরা। কিন্তু তাদের অধিকাংশ লোক আধা-দক্ষ ও অদক্ষ, যার কারণে পাশাপাশি ভারত, শ্রীলঙ্কা, চীন বছরে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠায় তার তুলনায় আমরা খুবই নগন্য। কারণ তারা কারিগরি জ্ঞানে দক্ষ করে জনশক্তি রপ্তানি করে। অপরদিকে আমরা রপ্তানি করি কারিগরি জ্ঞানশূন্য এবং অদক্ষ জনগোষ্ঠী। বর্তমান বিদেশে দক্ষ জনশক্তির প্রচুর চাহিদা রয়েছে, তাই নতুন প্রজন্মকে দক্ষ জনশক্তি হিসাবে গড়ে তুলতে পারলে কর্মসংস্থান যেমন হবে তেমনি রেমিট্যান্স ও বৃদ্ধি পাবে।

কারিগরি শিক্ষা ছাড়া পৃথিবীতে কোন জাতি উন্নতি করতে পারে নাই। বিশাল জনসংখ্যার এ দেশকে এগিয়ে নিতে হলে সবাইকে প্রযুক্তির উপর দক্ষতা অর্জন করতেই হবে। কিন্তু আমাদের সমাজে কারিগরি শিক্ষা নিয়ে সমাজে এখনও ইতিবাচক মনোভাব গড়ে ওঠেনি। অনেকের ধারণা এটি স্বল্প মেধাবি এবং নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখা। তাই গতানুগতিক ধারায় আমরা সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছি, এতে দিন দিন শিক্ষার হার বাড়ার সাথে সাথে বেকারত্ব ও বাড়ছে।

পৃথিবীতে যে জাতি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় যত বেশী উন্নত, অর্থনৈতিক ভাবেও সে জাতি তত বেশী এগিয়ে, যেমন – জাপান, কোরিয়া, চীন ইত্যাদি। তাই বর্তমান সরকার কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার উন্নয়নে অধিক গুরুত্ব দিয়েছে। শিক্ষা হওয়া উচিৎ দক্ষতানির্ভর। কারন দক্ষতা অর্জন করতে না পারলে শিক্ষা নিয়ে অনেককেই বেকারত্বের যন্ত্রণা ভোগ করতে হবে, সাথে সাথে পরিবারও বেকারত্বের এ যন্ত্রণা ভোগ করবে। দক্ষতানির্ভর কারিগরি শিক্ষাই কেবল পারে দেশকে দারিদ্র্যের দুষ্ট চক্র থেকে মুক্ত করতে। দেশকে মধ্যম ও উচ্চ আয়ের দেশে রূপান্তর করতে বর্তমান সরকার এরই মধ্যে কারিগরি শিক্ষায় ১৫% এর অধিক ভর্তি হার নিশ্চিত করেছে। সরকার এই হার ২০২০ সালের মধ্যে ২০% ও ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০% করার জন্য নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে সরকার এই হার ৬০% এ উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যাপক কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার পাশাপাশি দেশপ্রেম, মানবিক মূল্যবোধ, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জাতীয় দায়বদ্ধতার বিষয়গুলো প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।

কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ জনশক্তি গড়ে দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার দ্রুত উন্নতি ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সরকার খুব শিগগির দেশে ২৩টি বিশ্বমানের নতুন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন করবে। এ ছাড়া দেশের প্রতি উপজেলায় একটি করে কারিগরি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হবে। এরই মধ্যে ১০০ উপজেলায় কারিগরি স্কুল এন্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে। যেখানে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স সম্পন্নকারীদের প্রচুর কর্মসংস্থান হবে।

বর্তমানে দেশে ৪৯টি সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে দু’লক্ষাধিক শিক্ষার্থী অধ্যায়ন করছে। সেখান থেকে পাস করে দেশে ডুয়েট সহ ১০ টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। শুধু ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স সম্পন্ন করে উচ্চ শিক্ষার জন্য নতুন একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপনে কাজ করছে সরকার।

এসএসসি পাস করার পর পলিটেকনিক এ ভর্তি হয়ে চার বছর মেয়াদি কোর্স থেকে পাস করে ছেলে মেয়েরা সরকারি, অাধা সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে ২য় শ্রেণী পদমর্যাদায় উপসহকারী প্রকৌশলী পদে (১০ম গ্রেড) চাকরিতে প্রবেশ করছে। পাশাপাশি দেশ-বিদেশে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থায় ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং এর প্রচুর কর্মসংস্থান হচ্ছে এবং নিজেকে উদ্যোগক্তা হিসাবে দাঁড় করাতে অফুরন্ত সুযোগ রয়েছে। অথচ কর্মসংস্থানের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষা জীবন শেষ করে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়ে চাকরি যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে বয়সসীমা ৩০ বছর শেষ করে বেকারত্ব অভিশাপ মাথায় নিয়ে ঘুরছে।

ইতিমধ্যে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হয়েছে, তাই সচেতন নাগরিক হিসাবে উচিত হবে, নতুন প্রজন্মকে বেকারত্ব অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে এবং অর্থনৈতিক ভাবে সমাজ ও দেশকে সমৃদ্ধ করতে নিজের পরিচিতদের কারিগরি শিক্ষা গ্রহণের লক্ষ্যে বাংলাদেশের সরকারি ৪৯ টি পলিটেকনিক এ যুগোপযোগী টেকনোলজিতে ভর্তি করে উন্নত বাংলাদেশ গড়তে ভূমিকা রাখা।

মো. বখতিয়ার হোসেন
ইন্সট্রাক্টর (টেক/মেকানিক্যাল)
বরিশাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, বরিশাল।

আপনার মতামত লিখুন :