শুধু প্রথম শ্রেণি নয়, পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লটারিতে ভর্তির পরিকল্পনা

adminadmin
  প্রকাশিত হয়েছেঃ  ০১:১৮ PM, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এডুকেশনটুডে রিপোর্ট

প্রথম শ্রেণির পর এবার প্রাথমিকে দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতেও লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তির পরিকল্পনা করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এর ফলে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রাথমিকের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত কোনো ধরনের ভর্তি পরীক্ষা না নিয়ে লটারির মাধ্যমেই শিক্ষার্থী ভর্তি করা হতে পারে। তবে মাধ্যমিক স্তরে ভর্তি পরীক্ষা চালুর সিদ্ধান্ত আগের মতোই বহাল থাকবে।

প্রথম শ্রেণি ছাড়া অন্যান্য শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকের মধ্যেই আপত্তি ছিল। কারণ, ভর্তি পরীক্ষাকে ঘিরে নতুন করে কোচিং বাণিজ্যের প্রসার এবং শিশুদের ওপর তীব্র মানসিক চাপসহ নানা অসুবিধার আশঙ্কা করা হচ্ছিল। পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক শিশুকে নিয়ে নতুন করে ভর্তি পরীক্ষা আয়োজন করাও শিক্ষা প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

এমন বাস্তবতায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিদ্যালয়গুলোতে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি আগের মতো লটারির মাধ্যমেই রাখার কথা ভাবছেন নীতিনির্ধারকেরা। শিক্ষা বিভাগের ঊর্ধ্বতন দুটি সূত্র এই পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে।

পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত হলে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিকের কোনো শ্রেণিতেই ভর্তি পরীক্ষা থাকছে না; লটারির মাধ্যমেই ভর্তিপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। তবে মাধ্যমিক স্তরে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে।

এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন গতকাল সোমবার সচিবালয়ে বলেন, তারা বিষয়টি পর্যালোচনা করছেন। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এর আগে গত মার্চে এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী ঘোষণা দেন, ভর্তিতে লটারির পরিবর্তে লিখিত ভর্তি পরীক্ষা চালু করা হবে। সে সময় তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা লটারি ব্যবস্থা প্রত্যাহার করলাম।’

এরপর থেকেই শিক্ষাবিদ ও অংশীজনেরা বলে আসছিলেন, বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরে লটারির পরিবর্তে ভর্তি পরীক্ষা চালু হলে শিশুদের ওপর অযাচিত চাপ বাড়বে। সেই সঙ্গে কোচিং ও প্রাইভেটনির্ভরতা ফিরে আসবে, যা শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্যকে আরও উসকে দেবে। ইতোমধ্যে পরীক্ষার প্রস্তুতির নামে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় কোচিং কার্যক্রম শুরুর অভিযোগও পাওয়া গেছে।

একসময় স্কুলে ভর্তির নামে অল্প বয়সেই শিশুদের তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে ফেলা হতো। কোচিং ও প্রাইভেট তখন নিয়মে পরিণত হয়েছিল। নামী স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করাতে অভিভাবকেরা ছুটতেন কোচিং সেন্টারে। ভর্তিকে ঘিরে আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিস্তর অভিযোগ ছিল। ফলে সাধারণ ও অসচ্ছল পরিবারের সন্তানদের জন্য নামী বিদ্যালয়ে পড়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এ নিয়ে গণমাধ্যমে দীর্ঘদিন আলোচনা-সমালোচনা চলে।

এমন প্রেক্ষাপটে প্রথমে শুধু প্রথম শ্রেণিতে লটারি ব্যবস্থা চালু হয়। ২০১১ শিক্ষাবর্ষে যেসব সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি রয়েছে, সেখানে পরীক্ষার বদলে লটারির মাধ্যমে ভর্তি বাধ্যতামূলক করা হয়। পরের বছর বেসরকারি বিদ্যালয়েও একই নিয়ম কার্যকর হয়। তবে দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি তখনো পরীক্ষার মাধ্যমেই চলত।

পরবর্তী সময়ে করোনা মহামারির কারণে ২০২১ শিক্ষাবর্ষে সব শ্রেণিতেই লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তির নিয়ম চালু করা হয়, যা এত দিন অব্যাহত ছিল।

এখন সেই প্রক্রিয়ায় আবারও পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে গত ৮ আগস্ট প্রথম শ্রেণির ক্ষেত্রে ভর্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্ত বাতিল করে লটারি বহাল রাখার কথা জানানো হয়। এখন নতুন পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে প্রথম শ্রেণির সঙ্গে দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতেও লটারিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। অর্থাৎ প্রাথমিক স্তরের পুরোটাতেই লটারি থাকছে।

শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আগামী শিক্ষাবর্ষের ভর্তির সময় ঘনিয়ে আসায় এ বিষয়ে দ্রুত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারিক মনজুর বলেন, কোনো কোনো স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করাতে অভিভাবকদের অতিরিক্ত আগ্রহ থাকে। সমস্যার মূল সূত্রপাত এখান থেকেই। এই প্রবণতা দূর করতে তথাকথিত ‘ভালো’ ও ‘খারাপ’ স্কুলের ব্যবধান ঘোচাতে হবে। প্রাথমিকে শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য পরীক্ষা নেওয়া হলে সেখানে ব্যর্থ হয়ে কোমলমতি শিশুদের মধ্যে হীনম্মন্যতা তৈরি হতে পারে, যা পরবর্তী জীবনে তার বিকাশে স্থায়ী বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ভর্তি পরীক্ষার দাবিটি মূলত কোচিং সেন্টার ও এক শ্রেণির সুবিধাভোগী শিক্ষকের। এই বাণিজ্য এত বড় যে পরীক্ষার পক্ষে সাফাই গাওয়ার পক্ষের অভাব নেই। এমনকি দেখা গেছে, কোনো শ্রেণির ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ওই শ্রেণির নির্ধারিত শিখন-যোগ্যতার চেয়েও অনেক কঠিন করা হয়। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের সার্বিক কল্যাণের কথা বিবেচনায় রেখে ভর্তিতে লটারিকেই আমরা শ্রেয়তর পদ্ধতি বলব। তবে এই লটারির স্বচ্ছতা নিয়ে অভিভাবকদের মনে সংশয় রয়েছে। তাই পুরো কার্যক্রমে আরও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।’

আপনার মতামত লিখুন :