এডুকেশন টুডে

  • Full Screen
  • Wide Screen
  • Narrow Screen
  • Increase font size
  • Default font size
  • Decrease font size

জামালপুর

ইমেইল প্রিন্ট

পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ ও যমুনা নদীর বিধৌত অঞ্চল নামে খ্যাত উত্তরে গারো পাহাড়, দক্ষিণে টাঙ্গাইল জেলার মধুপুরের গড়, পূবে ময়মনসিংহ জেলা, পশ্চিমে যমুনা নদী বেষ্টিত সৌন্দর্যমণ্ডিত লীলা ভূমির নাম জামালপুর জেলা। ব্রহ্মপুত্র নদীর উত্তরে পাহাড়জঙ্গল বেষ্টিত উঁচু-নিচু ভূমির একাংশ কামরুপ এবং দক্ষিণে সিংহজানি ছিল প্রৌণ্ড রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। যমুনা ব্রহ্মপুত্রের ভাঙাগড়ায় কাদামাটি জমে এখানে চাষযোগ্য সমতল ভূমি জেগে ওঠে। কার্যক্রমে বিভিন্ন জনগোষ্ঠি এখানে বসতি স্থাপন করে। প্রাচীন কামরূপের একাংশ এবং গড় সিংহজানি এলাকা মোঘল ও পাঠান আমলে পাতিলাদহ পরগনার অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই পাতিলাদহ পরগনার উত্তর-পূর্ব অংশই আজকের জামালপুর।
ভৌগোলিক অবস্থান
ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে জামালপুর জেলার উত্তরে শেরপুর ও কুড়িগ্রাম জেলা। দক্ষিণে টাঙ্গাইল, পূর্বে ময়মনসিংহ, পশ্চিমে বগুড়া ও গাইবান্ধা জেলা অবস্থিত।
জেলার নামকরণ
প্রখ্যাত অলি হযরত শাহজামাল (রহঃ) নামে নামকরণ করা হয় জামালপুর। জামালপুর জেলার নামকরণের ইতিহাস উদঘাটন করে যতটুকু জানা যায়, প্রায় হাজার বছর পূর্বে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের বিদ্রোহী সন্ন্যাসীদের আড্ডাখানা ছিল। তাই তাদের আড্ডাখানা-বসতির জন্য প্রথমে এলাকাটি সন্ন্যাসীনগর নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৭৫৭ সালের পর ১৮৩৮ সালের তৎকালীন বৃটিশ গভর্মেন্ট এ অঞ্চলে রেল প্রতিষ্ঠা করে। সেসময় জামালপুর রেলওয়ে স্টেশনের নামকরণ করা হয় সিংহজানী রেলওয়ে জং। কালক্রমে এখন তা পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানে জামালপুর টাউন জং নামে পরিচিতি লাভ করেছে। জামালপুর জেলায় ১২০১ থেকে ১৫০৩ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল- ইয়েমেন থেকে বেশ কজন প্রখ্যাত অলির আগমন ঘটেছিল। তাদের মধ্যে অন্যতম হযরত শাহ সুফি সৈয়দ শাহ জামাল ইয়েমেনী জামালপুরী (রঃ) অন্যতম। তিনি একাধারে ইসলাম প্রচারের মধ্য দিয়ে তার জীবন অতিবাহিত করেন। তার কর্মবহুল জীবনের যবনিকা ঘটলে জামালপুর সদর থানার সন্নিকটে তাকে সমাহিত করা হয়। যা এখন হযরত শাহ জামাল (রঃ)-এর রওজা শরীফ। পর্যায়ক্রমে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও বলিষ্ঠতা বৃদ্ধি পেলে সন্ন্যাসীনগর কিংবা সিংহজানী নাম পরিবর্তন করে প্রখ্যাত অলির নামে নামকরণ করা হয় জামালপুর। বর্তমানে জনপদটি জামালপুর জেলা নামে খ্যাতি অর্জন করেছে।
জেলার ইতিহাস
ধারণা করা হয় যে, প্রাচীন বঙ্গের গৌড়ের সেন বংশের রাজত্বকালে (১১০০-১২০৩ খ্রী.) হিন্দুদের মধ্যে যখন কলীন প্রথার প্রচলন হয়, তখন এই এলাকায় জনবসতি গড়ে উঠে। এ সময় গঞ্জের হাটের কাছের একটি এলাকায় শিবমিন্দর স্থাপিত হয়। পরবর্তী সময়ে কাছাকাছি এলাকায় স্থাপিত হয় দয়াময়ী মন্দির। একসময় শিবমন্দিরকে ঘিরে একশ্রেণীর হিন্দু সন্ন্যাসীদের আনাগোনা শুরু হয় এই অঞ্চলে। পরে দূরদেশ থেকে আগত এই সব হিন্দু সন্ন্যাসীরা আস্তানা গাড়ে এই শিবমন্দিরে। হিন্দু সন্ন্যাসীদের আগমনে এবং তাদের পদচারণায় অঞ্চলটি গঞ্জের হাট থেকে সন্ন্যাসীগঞ্জ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ক্রমান্বয়ে হিন্দু জমিদারদের উদ্ভব হলে সন্ন্যাসীগঞ্জকে মৌজা তৈরি করে এর নাম রাখেন সিংহজানী। এই সিংহজানী মৌজা থেকেই আজকের জামালপুর জেলা। জেলা শহরের দুইটি বিদ্যালয়ের নামের সাথে সিংহজানী নামটি আজও সমুন্নত।
জামালপুর ময়মনসিংহ জেলার মধ্যে প্রথম মহকুমা হিসেবে ১৮৪৫ সালে মর্যাদা লাভ করে। মহকুমা সৃষ্টি হওয়ার ১৩৩ বছর পরে ১৯৭৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর জেলার মর্যাদা পায়। জামালপুর জেলা গঠনের আন্দোলন বঙ্গভঙ্গের পরে ১৯১২ সালেই সূচনা হয়। ১৯১২ সালে লর্ড কার্জন জামালপুরকে জেলা করার ঘোষণা দেন। ১৯১৯ সালের দিকে ধনবাড়ীর নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী ধনবাড়ীকে জেলা সদর করে জামালপুর ও টাঙ্গাইলকে নিয়ে একটি জেলা করার প্রস্তাব করেন। কিন্তু এতে জামালপুর ও টাঙ্গাইলবাসী কোন পক্ষই সমর্থন করেনি। ১৯২০ সালে টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর থানার কয়েকটি গ্রাম সরিষাবাড়ী থানার সাথে সংযুক্ত করা হয়। ১৯৩৮ সালে তৎকালীন বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিদের উদ্যোগে জামালপুরকে জেলা করার দাবি সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। জামালপুর না টাঙ্গাইল কোথায় জেলা সদর হবে এ নিয়ে তৎকালীন বৃটিশ সরকারও কোনো সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেনি। এ সময়ে বন্যা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ইতাদি কারণে জামালপুর জেলার বাস্তবায়ন পিছিয়ে পড়ে। ঐ সময়ে কংগ্রেস ও মুসলিমলীগের বহু প্রভাবশালী নেতা থাকলেও নিজেদের কোন্দলের কারণে তারা জামালপুর জেলার বাস্তবায়ন দেখে যেতে পারেননি, যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট তুলে ধরতে পারেননি জামালপুর জেলা গঠনের প্রয়োজনীয়তা। যে কারণে জামালপুর জেলা প্রতিষ্ঠিত হতে প্রায় ১৩৩ বছর সময় লেগেছে।
১৯৭১ সালে ১০ ডিসেম্বর জামালপুর হানাদার বাহিনী মুক্ত হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরেই জামালপুরকে জেলা করার দাবী আবারো বেগবান হয়ে উঠে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ১৯৭৫ সালে জামালপুরকে জেলা করার প্রতিশ্রুতি দেন। ১৯৭৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর জামালপুর-বাসীদের জন্য একটি আনন্দের দিন। কারণ এ দিনে জামালপুরকে স্বাধীন বাংলাদেশের ২০তম জেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়
জামালপুর জেলার বর্তমান অবস্থা
জামালপুর জেলার আয়তন ২০৩১.৯৮বর্গ কিলোমিটার। জামালপুর সদর, মেলান্দহ, ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, বকসিগঞ্জ, মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ী। এই ৭টি উপজেলা নিয়ে গঠিত জামালপুর জেলা। জাতীয় সংসদীয় আসনসংখ্যা ৫টি। পূর্ণাঙ্গ থানা ৮টি। পৌরসভা মোট ৭টি। ইউনিয়ন সংখ্যা ৬৮টি। মৌজার সংখ্যা ৮৪৪টি। ১৩৬২টি গ্রাম নিয়ে গঠিত হয়েছে জামালপুর জেলা। জেলার বর্তমান লোকসংখ্যা পুরুষ ১১লাখ ১৫ হাজার। মহিলা ১০লাখ ৫০হাজার। মোট জনসংখ্যা প্রায় ২২ লাখ ৬৫ হাজার। প্রধান অর্থকারী ফসল ধান,পাট, আখ, বেগুন, সরিষা, ভুট্টা, আলু ইত্যাদি। জেলার সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ও দেশজুড়ে সমাদৃতÑ কাঁসার শিল্প, নকশি কাঁথা ও বেগুন।
ইতিহাসবহুল স্থান
ব্রিটিশ শাসনামলে উপমহাদেশের স্বাধীনতার অগ্রদূত মহাত্মা গান্ধীর স্বদেশি মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছিল ভারতবর্ষের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে এ অঞ্চলের মানুষের ক্ষুধা, দারিদ্র্য আর পরাধীনতার অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে গান্ধীর আদর্শ অনুপ্রাণিত করেছিল বাংলা ব-দ্বীপের লাখো মানুষকে। স্বদেশি চেতনায় সারা ভারতবর্ষের মতো বাংলায়ও এ সময় গড়ে ওঠে অনেক গান্ধী আশ্রম। ১৯৩৪ সালে জামালপুর মহকুমা কংগ্রেসের সম্পাদক নাসির উদ্দিন সরকার মেলান্দহ উপজেলায় গড়ে তোলেন এক গান্ধী আশ্রম। শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে ঝিনাই নদীর তীরে তাঁর নিজের গ্রাম কাপাসহাটিয়ায় আশ্রমটির অবস্থান।
গান্ধীভক্ত নাসির সরকার এ আশ্রমে গ্রামের মানুষকে স্বদেশি চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে চরকায় সুতা তৈরি, হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ,  লেখাপড়া ও শরীরচর্চা কার্যক্রম চালাতেন। এই আশ্রম তখন পরিণত হয়েছিল ওই অঞ্চলের মুক্তিকামী মানুষের মিলনমেলায়। বিভিন্ন সময়ে এ আশ্রমে এসেছিলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, কমরেড মণি সিংহ, বারীন দত্ত, খোকা রায়, অনিল মুখার্জি, প্রফেসর শান্তিময় রায়, কমরেড আশুতোষ দত্ত, আন্দামানফেরত কমরেড রবি নিয়োগী, নগেন মোদক, বিধূভূষণ সেন, সুরেন্দ্র মোহন ঘোষ, মনোরঞ্জন ধর, নরেন নিয়োগী, রণেশ দাশগুপ্ত, সত্যেন সেন, ইসমাইল হোসেন সিরাজী, কৃষক নেতা হাতেম আলী খান, আবদুস সাত্তার, হেমন্ত ভট্টাচার্য, মন্মথনাথ দে, খন্দকার আবদুল বাকীসহ অনেক বিশিষ্টজন। তাঁরা বিভিন্ন রাজনৈতিক বৈঠকেও মিলিত হয়েছিলেন এখানে।
দেশভাগের পর মুসলিম লীগের সমর্থকরা ১৯৪৮ সালে গান্ধী আশ্রমটি গুঁড়িয়ে দেয়। তাদের হামলায় বুকের পাঁজর ভেঙে গুরুতর আহত হন নাসির উদ্দিন সরকার। হামলার পর টিকে থাকে শুধু আশ্রমের অফিসঘরটি। কালের বিবর্তনে মেলান্দহের বাতিঘর গান্ধী আশ্রম বন্ধ হয়ে যায়।
দীর্ঘদিন পর ২০০৬ সালে স্থানীয় গ্রামবাসীর উদ্যোগে একটি ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে পুরনো অফিসঘরকে কেন্দ্র করে পুনরায় গড়ে তোলা হয়েছে গান্ধী আশ্রমটি। গান্ধী আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মুক্তিসংগ্রাম জাদুঘর। এই গান্ধী আশ্রম ও মুক্তিসংগ্রাম জাদুঘর বর্তমানে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের কাছে হয়ে উঠেছে ইতিহাস শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র। হয়ে উঠেছে ইতিহাসের বাতিঘর। প্রতিদিন কাপাসহাটিয়ার গান্ধী আশ্রম ও মুক্তিসংগ্রাম জাদুঘরে শিক্ষার্থী ছাড়াও আসেন অনেক দেশি-বিদেশি দর্শনার্থী। এখানে রয়েছে স্বদেশি আন্দোলন সময়কার আশ্রমে ব্যবহৃত চরকা, চেয়ার-টেবিল, পুরাতন সিন্দুক, তৎকালে আশ্রমের ছাত্রীদের তৈরি নানা সূচিকর্ম, পাঠাগারের দুর্লভ বই। রয়েছে মুক্তিসংগ্রামের নানা স্মৃতিচিহ্ন, ছবি, বিভিন্ন বধ্যভ‚মির মাটি। প্রদর্শন করা হয় ইতিহাসের প্রামাণ্যচিত্র। আশ্রমের মূল আদর্শ ধারণ করে গ্রামের মানুষকে স্বনির্ভর করতে বিনামূল্যে কম্পিউটার ও সেলাই প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এক একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত কাপাসহাটিয়ার গান্ধী আশ্রম ও মুক্তিসংগ্রাম জাদুঘর হাজারো দর্শনার্থীর ইতিহাস চেতনাকে করেছে সমৃদ্ধ। এই আশ্রমে নিভৃতে দর্শনার্থীর মনে ছড়িয়ে দিচ্ছে দেশপ্রেম, সংগ্রামের সাহস ও প্রেরণা। অনেকে মনে করেন, এই প্রতিষ্ঠানটিকে অনুসরণ করে দেশের অন্য গ্রামগুলোয় এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে নতুন প্রজন্ম খুঁজে পেতে পারে তার সংগ্রাম ও দেশপ্রেমের ঠিকানা।

Share/Save/Bookmark