এডুকেশন টুডে

  • Full Screen
  • Wide Screen
  • Narrow Screen
  • Increase font size
  • Default font size
  • Decrease font size

প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ

ইমেইল প্রিন্ট

মহাকালের আবাহনে বাংলা নববর্ষ ১৪২২ পূর্ণ করবে। বাঙালির নিজস্ব বর্ষপঞ্জিতে নতুন বছরের পরিক্রমা শুরু হতে যাচ্ছে। পয়লা বৈশাখ বা পহেলা বৈশাখ বাংলা পঞ্জিকার প্রথম দিন। বৈশাখের ১ তারিখ বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নববর্ষ হিসেবে বিশেষ উৎসবের সাথে পালিত হয়। ত্রিপুরায় বসবাসরত বাঙালিদের এটি  একটি সর্বজনীন উৎসব। ব্যবসায়ীরা এই দিনটিকে নতুনভাবে ব্যবসায় শুরু করার উপলক্ষ হিসেবে বরণ করে নেয়। এক সময় গ্রেগরিয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে ১৪ এপ্রিল বা ১৫ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালিত হতো। আধুনিক বা প্রাচীন যেকোনো পঞ্জিকাতেই এই বিষয়ে মিল রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল এই উৎসব পালিত হয়। বাংলা একাডেমি কর্তৃক আধুনিক পঞ্জিকা অনুসারে এই দিন নির্দিষ্ট করা হয়েছে। বাঙালির কাছে দিনটি কল্যাণ ও নতুন জীবনের প্রতীক। আর সে কারণেই এরা অতীতের ভুলত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন করে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় উদযাপন করে নববর্ষ। আগমণী গান গেয়ে স্বাগতম জানায় নতুন বছরকে।
পহেলা বৈশাখ দিনটি বাঙালির কাছে একটি প্রেরণার দিন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ এক অভিন্ন হৃদয়াবেগ নিয়ে মিলিত হয় এই দিনটিতে। পয়লা বৈশাখ ছাড়া এত বড় সর্বজনীন উৎসবের উপলক্ষ্য বাঙালির আর নেই। এই উৎসবের মধ্য দিয়ে বাঙালি তার আপন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আলোকে জাতিসত্তার পরিচয়কে নতুন তাৎপর্যে উপলব্ধি করে গৌরব বোধ করে। এই গৌরব ও চেতনাই বাঙালিকে প্রেরণা জুগিয়েছে আপন অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে।
বৈশাখের ইতিবৃত্ত : এখন আমরা বাংলা নববর্ষ হিসেবে যে দিনটি পালন করছি তা বহু আগে থেকেই প্রচলিত ছিল তবে কিছুটা ভিন্নভাবে। যতোটা জানা যায়, এক সময় বৈশাখের জায়গায় অগ্রহায়ণ ছিল বাংলা সনের প্রথম মাস। নামের সাথে এর মিল খুজতে গেলে দেখা যায় যে, অগ্র মানে প্রথম, হায়ন মানে বর্ষ বা ধান। আগে এই মাস থেকে বছর গণনা আরম্ভ হতো বা এই মাসেই ফসল কাটা হতো এমন ধারণা প্রচলিত রয়েছে।
আল বেরুনি ১০৩০ খ্রি. তাঁর ভারততত্ত (কিতাব-উল হিন্দ) গ্রন্থে বলেছিলেন যে, তিনি উপমহাদেশে শীহর্ষাব্দ, বিক্রমাব্দ, শকাব্দ, বলভাব্দ ও গুপ্তাব্দের প্রচলন দেখেছিলেন। এর মধ্যে বাংলাদেশে গুপ্তাব্দ ও শকাব্দের প্রচলন ছিল। খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতকের কোনো এক সময় থেকে শুরু করে ১২০৪ বা ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এই শকাব্দ প্রচলিত ছিল। ধারণা করা হয়, এই শকাব্দের সাথে বঙ্গাব্দের প্রচলনের হয়ত কোনো সম্পর্ক থেকে থাকবে। অন্তত বঙ্গাব্দের নামের দিক থেকে।
তবে হিন্দু সৌর পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা বারোটি মাস অনেক আগে থেকেই পালিত হতো। এই সৌর পঞ্জিকা শুরু হতো গ্রেগরিয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতে। হিন্দু সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরল, মনিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিলনাড়ু ও ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনেক আগে থেকেই পালিত হতো। তবে তখন নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ আর্তব উৎসব তথা ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হতো। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ। প্রাযুক্তিক প্রয়োগের ব্যবহার শুরু না হওয়ায় কৃষকদের ঋতুর ওপরই নির্ভর করতে হতো।
ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করত। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। কৃষকরা খাজনা প্রদানে অসমর্থ হলেও অসময়ে কৃষকদেরকে খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করা হতো। প্রচলিত মত অনুসারে খাজনা আদায়ের সুষ্ঠতা প্রণয়নের লক্ষ্যে এবং কৃষকদের সুবিধার্থে মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন। সম্রাটের আদেশ মতে তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত  জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। ১৫৮৪ খ্রি. ১০ মার্চ মতান্তরে ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর হয় আকবরের  সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকেই। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।
বাংলা বর্ষ প্রচলনের ক্ষেত্রে আরো কয়েকজন ব্যক্তিত্বের নাম উল্লেখযোগ্য। এরা হচ্ছেন খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতকের তিব্বতীয় বিজেতা স্রংসান গ্যাম্পো, সপ্তম শতকের প্রথমভাগের গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক এবং বাংলার স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ। ১৫৫৬ সালে হিজরি সন ছিল ৯৬৩। বাংলা সন তখন থেকে যাত্রা শুরু করে। বঙ্গাব্দ শুরু হলেও এখন যেভাবে মাসের সাতটি দিন প্রচলিত তখন তেমনটি ছিল না। সম্রাট আকবরের সময় মাসের প্রত্যেকটি দিনের জন্য পৃথক নাম ছিল। তখন প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষদিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। এর পরের দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভ‚মির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করাতেন। এ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয় যার রূপ পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানে এই পর্যায়ে এসেছে। একসময় বাংলা নববর্ষের মূল উৎসব ছিল হালখাতা আর তখন এটি পুরোপুরিই ছিল একটি অর্থনৈতিক ব্যাপার। গ্রামে-গঞ্জে নগরে ব্যবসায়ীরা নববর্ষের প্রারম্ভে তাঁদের পুরানো হিসাব-নিকাশ সম্পন্ন করে হিসাবের নতুন খাতা খুলতেন। প্রকৃতপক্ষে হালখাতা হলো বাংলা সনের প্রথম দিন ব্যবসায়ের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। আকবরের সময় প্রচলিত বঙ্গাব্দের সাথে খ্রিষ্টীয় সনের দিন তারিখের পার্থক্য থাকার কারণে সাধারণ মানুষের পক্ষে উভয় সন গণনায় সমস্যা হতো। এজন্য ১৯৬৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমির তত্ত্বাবধানে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে বঙ্গাব্দ সংস্কার কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি চার বছর পর পর চৈত্র মাস ৩০ দিনের পরিবর্তে ৩১ দিনে গণনা করার পরামর্শ দিয়ে বঙ্গাব্দের সংস্কার প্রস্তাব করে। ১৯৬৬ সালে সংস্কার প্রস্তাব করা হলেও বাংলা সনের সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে কমিটির প্রস্তাবনা ১৯৯৬ সালে গ্রহণ করা হয়। ১৪ এপ্রিলকে স্থায়ীভাবে বাংলা নববর্ষ শুরুর দিন হিসেবে ঠিক করা হয়।
বাংলা মাসগুলোর নামকরণ : প্রচলিত  মতামত অনুসারে বিভিন্ন নক্ষত্রের নাম থেকে বাংলা সনের মাসগুলোর নামকরণ করা হয়েছে। ধারণা করা হয় যে, বিশাখা থেকে বৈশাখ, জ্যৈাষ্ঠা থেকে জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়া থেকে আষাঢ়, শ্রবণা থেকে শ্রাবণ, ভাদ্রপদ থেকে ভাদ্র, অশ্বিনী থেকে আশ্বিন, কৃত্তিকা থেকে কার্তিক, অগ্রাইহণ থেকে অগ্রহায়ণ, পুষ্যা থেকে পৌষ, মঘা থেকে মাঘ, ফল্গুনি থেকে ফাল্গুন এবং চিত্রা থেকে চৈত্র মাসের নামকরণ হয়েছে।
বৈশাখ উদযাপনের চিত্র : নতুন বছরের উৎসবের সাথে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। গ্রামে মানুষ ভোরে ঘুম থেকে উঠে নিজেকে এবং বাড়িঘরকে পরিপাটি করে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি বেড়াতে যায়। এ দিনটিতে ভালো খাওয়া, ভালো থাকা এবং ভালো জামাকাপড় পরতে পারাকে গ্রামবাসী ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গলজনক মনে করে। মিষ্টি, পিঠা-পায়েসসহ নানা রকম লোকজ খাবার তৈরির ধুম পড়ে যায় গ্রামের ঘরে ঘরে। অনেক জায়গায় ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। এই দিনের একটি পুরানো সংস্কৃতি হলো গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন। এর মধ্যে থাকে নৌকাবাইচ, লাঠি খেলা বা কুস্তির আসর। বাংলাদেশে এরকম কুস্তির সবচেয়ে বড় আসরটি  হয় ১২ বৈশাখ চট্টগ্রামÑএর লালদিঘি ময়দানে। নববর্ষকে উৎসবমুখর করে তোলে বৈশাখী মেলা। এটি মূলত সর্বজনীন লোকজ মেলা। মেলাতে থাকে নানা রকম কুটির শিল্পজাত সামগ্রীর বিপণন। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকগায়ক ও লোকনর্তকদের উপস্থিতি থাকে মেলায়। যাত্রা, পালাগান, কবিগান, জারিগান, গম্ভীরাগান, গাজীরগান, আলকাপগানসহ বিভিন্ন লোকসংগীত, বিভিন্ন আখ্যান উপস্থাপন, পুতুলনাচ, নাগরদোলা, সার্কাস প্রভৃতি থাকে মেলার মূল আকর্ষণ হিসেবে। শহরাঞ্চলে নগর সংস্কৃতির আমেজেও এখন বৈশাখী মেলা বসে এবং এই মেলা বাঙালির অনাবিল মিলন মেলায় পরিণত হয়। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রায় সব শহরেই নানা বয়সী মানুষ সাড়ম্বরে উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠে। তবে শহরে এই দিনটিতে সকল নাগরিকের পোশাক পরিচ্ছদ, খাওয়া-দাওয়া, গানবাদ্য সবকিছুতেই প্রাধান্য পায় বাঙালিয়ানা। বিশেষত, ঢাকায় শহুরে নাগরিকদের গৎবাঁধা জীবনযাত্রায় যোগ হয় ভিন্নতার স্বাদ। এদিকে শহুরে নারীদের পরনে লাল সাদা শাড়ি, পুরুষদের পরনে নকশি পাঞ্জাবি, আর গালে আলপনা আঁকা ছোট্ট শিশুর নগরজুড়ে ঘোরাঘুরি যান্ত্রিক ঢাকার জনজীবনে এনে দেয় অনাবিল প্রশান্তি। রমনার বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতি গানের আসর, চারুকলায় মঙ্গল শোভাযাত্রা, রবীন্দ্রসরোবরে গানের আসর, বাংলা একাডেমিতে বৈশাখী মেলাসহ শহরজুড়ে আরও নানা আয়োজন থাকে শহরবাসীর মনোরঞ্জনের জন্য। নবীন গ্রীষ্মের প্রখর তাপ উপেক্ষা করে পথে পথে ঘুরে, কখনো বা রমনা-সোহরাওয়ার্দী-বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের গাছতলায় বসে তুমুল আড্ডায়  মেতে কেটে যায় শহরবাসীর উৎসবের বেলা। বাংলাদেশের যেসব স্থানে বৈশাখী মেলা বসে সেসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, সাভার, রংপুরের পায়রাবন্দ, দিনাজপুরের ফুলছড়ি ঘাট এলাকা, বগুড়ার মহাস্থানগড়, কুমিল্লার লাঙ্গলকোট, চাঁপাইনবাবগঞ্জে, মহেশপুর, খুলনার সাতগাছি, ময়মনসিংহ- টাঙ্গাইল অঞ্চল, সিলেটের জাফলং মনিপুর, বরিশালের ব্যাসকাঠি- বাটনাতলা, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, টুঙ্গিপাড়া, মুজিবনগর এলাকা ইত্যাদি। ঢাকার নিকটবর্তী শুভাঢ্যার বৈশাখী মেলা, সোলারটেক মেলা, মিরপুর দিগাঁও মেলা, কুকুটিয়া মেলা এবং রাজনগর মেলা উল্লেখযোগ্য। দিনাজপুরের ফুলতলী, ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল, রাজশাহীর শিবতলীর বৈশাখী মেলাও বর্তমানে বিরাট উৎসবের রূপ নিয়েছে।

Share/Save/Bookmark